ঢাকা শনিবার, ১৯শে অক্টোবর ২০১৯, ৪ঠা কার্তিক ১৪২৬


মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে সু চির বিচার হতে পারে


১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৩:৩২

আপডেট:
১৯ অক্টোবর ২০১৯ ০০:১৬

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনে দেশটির সেনাবাহিনীর ভূমিকায় নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি। কারণ তিনিই দেশটির সর্বোচ্চ নেত্রী।

মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলেছেন, মিয়ানমারের বেসামরিক নেতা, একবার নোবেল বিজয়ী গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরিচিত। তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর সামরিক বাহিনীর হামলার কারণে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন।

জাতিসংঘের তদন্তকারীরা আরও বলেছেন, শুধু ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পর নিষ্ক্রিয় থাকছেন সু চি। অথচ তিনি প্রথম মিয়ানমারে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের আইকন হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিলেন।

জানা গেছে, ১৯৯১ সালে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি নোবেল পুরস্কার পান। তবে পুরস্কার পাওয়ার সময় তিনি দেশটিতে গৃহবন্দী হিসেবে ছিলেন। সু চির ছিল দীর্ঘদিন আন্দোলনের ইতিহাস। তবে তার আন্দোলন সহিংস ছিল না, যা নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছে।

মঙ্গলবার জেনেভায় জাতিসংঘের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাকে দেয়া এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারে স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির তদন্তকারীদের একটি প্যানেল বলেছে- মিয়ানমারে ৬ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গাকে নিয়মতান্ত্রিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হবে। যার জন্য সু চি তার দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।

নোবেল কমিটি তাদের বিবৃতিতে সু চিকে নোবেল পুরস্কার দেয়ার তিনটি কারণ উল্লেখ করেছিল, যার প্রতিটি লঙ্ঘন করেছেন তিনি।

১৯৯১ সালে অং সান সু চিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে নোবেল কমিটি বলেছিল, অং সান সু চিকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য তার অহিংস সংগ্রামের কারণে এটি দেয়া হচ্ছে। তিনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে একজন আদর্শ হিসেবে পরিণত হয়েছেন। বিশ্বের বহু মানুষের গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম মানবাধিকার ও জাতিগত শান্তি বজায় রাখায় তার শান্তিপূর্ণ সমর্থন ও অবিরত প্রচেষ্টার জন্যই এ পুরস্কার।

এখন তার ক্ষমতায়নে মিয়ানমারের পরিস্থিতি ভিন্ন। আর তার সরকারই যখন রোহিঙ্গাদের নির্যাতন নিপীড়নের জন্য দায়ী, তখন নিপীড়ক হিসেবে তার নামও চলে আসে।

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতনের কারণে ২০১৬ সালেই সু চির নোবেল শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়ার দাবি ওঠে। সে সময় অনলাইনে তার নোবেল শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়ার জন্য এক আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন লক্ষাধিক মানুষ।

মিশনের চেয়ারম্যান ও ইন্দোনেশিয়ার প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল মারজুকি দারুসমান এক বিবৃতিতে বলেছেন, গণহত্যা প্রতিরোধ, গণহত্যা তদন্ত ও শাস্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রে মিয়ানমার তার দায়বদ্ধতায় ব্যর্থ হয়েছে। তিনি মানবাধিকার কাউন্সিলকে বলেছেন যে নীতিতে ২০১৭ সাল থেকে সামরিক ও তাদের মিত্র মিলিশিয়ারা অপরাধ করেছে তা থেকে এখনো দায়মুক্তি অব্যাহত রয়েছে। বৈষম্য অব্যাহত রয়েছে। ঘৃণ্য বক্তৃতা অব্যাহত রয়েছে। নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে।

মঙ্গলবার মিয়ানমার ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের এ রিপোর্টকে ‘একতরফা অভিযোগ’ এবং ‘ভুল তথ্য’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। জেনেভাতে জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত কিউ মো তুন এই প্যানেলকে নিরপেক্ষতার অভাবের অভিযোগ করেছেন এবং বলেছেন এই প্রতিবেদনের ফলে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক অসুবিধা হবে।

মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষক ইয়াং লি বলেছেন, অং সান সু চির অধীনে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রাজনৈতিক বন্দী এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের মুখোমুখি ব্যক্তিদের তালিকা বেড়েছে। সামরিক বাহিনী কর্তৃক মানুষকে অপমান করার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সংখ্যাও বেড়েছে।

মানবাধিকার কাউন্সিলকে সম্প্রতি ইয়াং লি রিপোর্ট করেছেন, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানের অংশ হিসেবে সামরিক বাহিনী রাখাইন রাজ্যের বেসামরিক অঞ্চলে হেলিকপ্টার গানশিপ, ভারী আর্টিলারি এবং ল্যান্ড মাইন ব্যবহার করছে। রাখাইনে পুরুষদের মারাত্মক নির্যাতন করা হয়েছে এবং রাখাইন গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

তদন্তকারীরা বলেছেন, সেনা পদক্ষেপের বিষয়ে অং সান সু চির কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, তবে মিয়ানমারের পার্লামেন্টে ৬০ শতাংশ আসন নিয়ন্ত্রণকারী একটি দলের প্রধান হিসেবে তিনি এমন একটি সরকারকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যে সমস্ত আইন পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখে। বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং মানবাধিকারের জন্য সু চির ব্যাপক ও বিস্তৃত দায়িত্ব ছিল।

তদন্তকারীরা আরও বলেছেন, মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী উত্তর মিয়ানমারে কাচিন, শান এবং অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। যৌন সহিংসতা এই অভিযানের একটি প্রধান অংশ ছিল।

অনেক রোহিঙ্গা মুসলমান ক্যাম্পে আটকে রয়েছে, যেখানে তাদের পড়াশোনা বা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিরত রাখা হয়, জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব হয় না এবং বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইনের আওতায় থেকে যায়, এটি ‘অত্যাচারের হাতিয়ার’ হিসেবে পরিগণিত হয়।


বিষয়:


Top